হে মুসলিম বোন ঃ নিজ বাড়িতেও পর্দা করুন
মমিনুল ইসলাম মোল্লা
পর্দা মুসলিম বোনদের জন্য শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এটি একটি অবশ্যপালনীয় কাজ। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে এবং রাসুল ( সাঃ ) সহীহ হাদিসে বার বার এর উপর তাকিদ দিয়েছেন। তবে বাড়ি থেকে বের হবার সময় বোরকা পড়লেই পর্দার হক আদায় হয় না। বাড়ি- ঘরেও পর্দা করতে হবে।
আর পর্দার সাথে কালো কাপড়ের একটি পোশাকই জড়িত নয়; বরং দেহও মন এর জড়িত। তবে কেউ যদি বলে “ মনের পর্দা বড় পর্দা বইরের পর্দার দরকার নাই” তাহলে সে গোনাহগার হবে। মনের পর্দার সাথে সাথে বাইরের পর্দাও পালন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয়ই মনের খবর জানেন। তাই মুসলিম বোন ও আমাদের মা-চাচিদেরকে বাড়িতেও পর্দার সাথে জীবন অতিবাহিত করতে হবে। পর্দার সাথে যৌনতা, অশ্লিলতা ও বেহায়হাপনা সংশ্লিষ্ট। আমাদেও দেশে রাস্তাঘাটে কিংবা কর্মস্থলে যতগুলো যৌন হয়রানীর ঘটনা ঘটে তার চেয়ে বেশি ঘটে নিজ বাড়িতে ও প্রতিবেশী যুবকদের মাধ্যমে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মহিলারা তা গোপনে সহ্য করে নেন। কোন ক্ষেত্রে তা প্রকাশ পেলেও লোক-পারিবারিক/বংশীয় সম্মান রক্ষা ও লোক-লজ্জার ভয়ে সেগুলো ধামা-চাপা দেয় হয়। সেজন্য মুসলিম নারীকে অবশ্যই বাড়িতে পর্দার নিয়ম মেনে চলতে হবে। পর্দা রক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা কওে না দিলে পিতা, স্বামী ও পুত্রর আল্লাহর কাছে জবাবদিহী করতে হবে।ঘরই নারীদের জন্য অভয়াশ্রম। তাই ঘরকে আপন করে নেয়াই বুদ্ধিমতির কাজ। এত গৃহবন্ধীত্বের কোন প্র¤œ নেই। আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি প্রাণীকে তার নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। মাছ পানিতে বসবাস করবে, পাখীরা আকশে উড়ে বেড়াবে , এগুলো স্বাভাবিক ঘটনা। মহিলাদের কর্মক্ষেত্রের ব্যাপারে পবিত্র কোরান মজিদে বলা হয়েছে, “ আর তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে। প্রাচীন জাহেলী যুগের মতো তোমরা সৌন্দর্য প্রদর্শন করোনা। ” সাংসারিক প্রয়োজনে গায়রে মাহরামের সাথেও মহিলাদেকে যোগযোগ করতে হয়। এক্ষেত্রে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। তাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে পর্দা বজায় রেখেই তা করতে হবে। তবে সীমা লঙ্গন করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, মুসলিম নারীর কথা-বার্ত, চাল-চলন, আচার- আচরণ সবকিছুই পর্দার অন্তর্ভক্ত। “ আর যখন তোমরা কিছু চাবে পর্দার অন্তরাল থেকেই চাবে। এ বিধান তোমাদের ওতাদের হৃদয়ের জন্য অধিকতর পবিত্র” কুরাানের এ আয়াতের দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের দেশে বিশেষ করে গ্রামের বাড়িতে আমরা অনেকেই কারো অনুমতি না নিয়েই বা কোন প্রকার আওয়াজ না করে হুট করে ঘরে ঢুকে যাই। অথচ মায়ের ঘরে ছেলে অথবা মেয়ে ঢুকতেও অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে । বিশেষ করে দেবররা তো ভাবীর ঘরে ঢুকতেই পারে না। বিশেষ দিনগুলোতে বা কোন উৎসবে ইৎসাহী যুবকের বিভিন্ন আত্মীয়-–স্বজনের সাথে দেখা করতে যায়। এব্যপাওে মহিলাদেরকেও সচেতন থাকতে হবে। একবার এক অন্ধ সাহাবী নবিজির সাথে দেখা করতে এলে তিনি তার বিবিদেরকে ভেতরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তারা বল্লেন- হে আল্লাহর রসুল উনি তো অন্ধ। তখন রসুল ( সাঃ ) বল্লেন ,তোমরাতো অন্ধ নও। তাই আত্মীয়দেও সাথে দেখা- সাক্ষাতের ব্যাপারে ইসলামের সঠিক নির্দেশনা রয়েছে। উকবাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত রাসুলে কারীম ( সাঃ ) বলেন-তোমরা মহিলাদের সাথে দেখা- সাক্ষাত করা থেকে নিজেদেও বাঁচিয়ে রাখবে। মদিনার আনসারদেও মধ্য থেকে এক লোক প্রশ্ন করলো-হে আল্লাহর রাসুল! দেবর-ভাসুর ও অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে দেখা- সাক্ষাৎ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী ? তিনি উত্তরে বল্লেন, এ ধরণের আত্মীয় -স্বজন তো মৃত্যু। (সহিহ মুসলিম ) কেননা এধরণের লোকের সাথে বেপর্দাজনিত যে ধরণের বিপদ ঘটে তা সাধারণত অপরিচিতজনের সাথে ঘটে না। সুতরাং যৌথ পরিবারের দেবররা সকালবেলা পুকুর ঘাটে দাঁত ব্রাশ করতে করতে বিদেশে থাকা ভাইয়ের ব্যাপারে অতি উৎসাহ নিয়ে ( ভাবী ভাইয়ের খবর কী ? বেতন -টেতন কেমন পায় ? ভাইয়েরে কত দিন ধরে দেখিনা কবে আসবে? ) এসব আলাপ করা যাবে না। অথবা কোন কোন সময় দেখা যায় ভাবীর ঘরে চুপসারে স্কুল -কলেজে পড়–য়া ছেলেরা ঢুকে যায়। যেচে যেচে পান কিংবা চা খেতে চায় । তাদের কাছে ভাবী এক মজার মানুষ , যার সাথে প্রাণ খুলে- দিল খুলে সব কথা বলা যায় ( নাউজু বিল্লাহ্ )। এক্ষেত্রে ইচ্ছে থাকলেও নতুন বউয়েরা মুখ খুলে কিছু বলতে পারেন না। অথচ হাদিসে এসেছ- যদি কোন ব্যক্তি তোমার ঘরে অনমতি ছাড়া উঁকি মারে এবং তুমি একটি কঙ্কর নিক্ষেপ করে তার চোখকে অন্ধ করে দাও তাহলে তাতে কোন গুনাহ হবে না। ”( বোখারি ও মুসলিম ) এছাড়া নতুন বউকে বিয়ের পরদিন যুবক ছেলে-মেয়েরা হাতে ধরে হাত ধোয়ানোর একটি মারাত্বক সিস্টেম আমাদের সমাজে চালু রয়েছে। এটি সম্পূর্ণ নাজায়েজ কাজ। রাসুল ( সাঃ ) মহিলাদেরকে বায়াত করানোর সময় কখনও তাদেও হাত নিজের হাতে নিতেন না। বাড়িতে যদি ভগ্নিপতি, খালু, ফুফা বেড়াতে আসে তাদের সামনে বেপর্দা হওয়া যাবে না। এছাড়া একই বাড়িতে/ পাশের বাড়িতে বসবাসকারী কিংবা দুরের চাচাত , মামাত , খালাত , ফুফাত ভাই, বোনের দেবর, ভাবীর ভাই, প্রভৃতি আত্মীয় স্বজনের ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। ঢাকা থেকে দূরবর্তী একটি গ্রামে একটি কুমারী মেয়ে অপগর্ভবতী হয়ে গেলে প্রতিবেশীরা তার দাদীকে এব্যাপাওে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,কাওে সন্দেহ করমু ? পারুলের চাচাত ভাই বাদেওতা এ বাড়িতে কোন অন্য কোন ছেলে আসে না। তাই এধরণের ভাইদের ব্যপারে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে।
আল্লাহ বলেন, ঈমানদার নারীদেরকে বলুন ( নবিকে লক্ষ করে) তারা যেন তাদেও দৃষ্টিকে নত রাখে এবং যৌনাঙ্গেও হেফাজত করে। অন্য যায়গায় সুরা আযহাবে আল্লাহপাক বলেন, “হে নবি, আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগনকে,ও মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের ওড়না বা চাদরের কিছু অংশ নিজেদের বুকের উপর টেনে দেয়। ” পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখার কথাও বলা হয়েছে। মহিলাদের চেহারা খোলা রাখার ব্যাপারে বিতর্ক রয়েছে। ঈমাম আবু হানিফা, শাফেয়ী, ও ঈমাম আহম্মদ ইবনে হাম্বল এর বর্ণনানুসারে যৌন লালসা ছাড়া নারীর চেহারা ও হস্তদ্বয়ের দিকে স্বাভাবিক দৃষ্টি দেয়া বৈধ। হিজাব ও সালাতে নারীর পোশাক পচ্ছিদ- শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া ) মাহরামের ব্যাপরে পবিত্র কুরআন মজিদে তাদের স্বামী, পিতা, ( দাদা ও নানা ), শ্বশুর, ( দাদা শ্বশুর ও নানা শ্বশুর ), পুত্র ( ও নাতি ), স্বামীর পুত্র ( ও নাতি ), ভাই ( সহোদর ও বৈমাত্রেয় ) ভাতিজা, ভাগ্নে, আপন ( মুসলিম ) নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাস-দাসী, অধিনস্থ পুরুষ ( পৌরষত্ব বিলুপ্ত ) দের কথা বলা হয়েছে। বাড়িতে আসা গায়রে মাহরাম মেহমান, কাজের লোক, গৃহকর্তার বন্ধু বান্ধব কিংবা গৃহশিক্ষকের সাথে অতিরিক্ত কথা বলা যাবে না। বিশেষ প্রয়োজন না হলে তাদের সামনে না যাওয়াই ভালো। আল্লাহ বলেন মিহি সুরে কথা বলোনা । যাতে মনের গলদে আক্্রান্ত কোন ব্যক্তি প্রলুব্দ হয়ে পড়ে বরং পরিষ্কার সোজা ও স্বাভাবিক কথা বলো।এছাড়া সুরা আযহাবে সাজসজ্বা প্রদর্শন কওে বেড়ানোর ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে। বাড়িতে পর্দা বজায় রাখার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা পুরুষের দায়িত্ব। কথায় বলে ছেলে নষ্ট হাটে, মেয়ে নষ্ট ঘাটে। ” মহিলাদেে জন্য পৃথক পর্দা ঘেরা গোসলখানার ব্যবস্থা করা না গেলে , তারা গোসল করার সময় যাতে ছেলেরা আশে-পাশে ঘুরাঘুরি না করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। রান্না করার সময় দেবর, ভাসুর বা চাচা শ্বশুর জাতীয় কোন মুরব্বি সেখানে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আনেক পরিবারে পবিারের নারী পুরুষ সকলে একই ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার গ্রহণ করতে দেখা যায়। কর্তার কোন বন্ধু-বন্ধব বা পুরুষ আত্মীয়-স্বজন এলে তাদেরকে নিজ হাতে সমাদর করে খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। পর্দার আড়াল থেকে খেয়াল রাখলেই চলবে। একই সাথে বসে টেলিভিশনের প্রোগ্রাম দেখার বদঅভ্যাস বাদ দিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষের চেয়ে মোবইলের সংখ্যা বেশি। বাড়ির স্কুল-কলেজ পড়–য়া মেয়ে কিংবা বউরা যাতে প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা ছাড়া গল্প-গুজবে মত্ত হতে না পারে সেদিকে বয়স্কদের খেয়াল রাখতে হবে। প্রত্যক স¦ামীর উচিত স্ত্রীকে, ভাইয়ের উচিত বোনকে এবং পিতার উচিত কন্যাকে পর্দার শিক্ষা দেয়া। আল্লাহ শুধু মহিলাদেরই পর্দা কারা বা দৃষ্টি সংযত করার কথা বলেননি। পবিত্র কুরআনে বলা হয়ে হয়েছে, বিশ্বাসী পুরুষদের বলে দাও তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং নিজেদের অবশ্য আবরণীয় স্থানসমুহের হেফাজত করে। এটা তাদেও জন্য অধিক পবিত্র পদ্ধতি। যা কিছু তারা করে আল্লাহ তা জানেন। (সুরা নূরঃ ৩০ ) পরিশেষে আমরা বলতে পারি, হে বেহেস্ত প্রত্যাশী রমনী ঃ শুভ সংবাদ গ্রহণ করুন। বাড়ি- ঘরের লোকেরা অথবা প্রতিবেশীরা কটাক্ষ করলেও বাড়ির ভেতরেও পর্দা করার চেষ্টা করুন। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে পর্দার গুরুত্ব অনধাবন করার তওফিক দান করেন। আমিন।
লেখকঃ মমিনুল ইসলাম মোল্লা, প্রভাষক , সাংবাদিক ও ধর্মীয় গবেষক, কুমিল্লা।

0 Comments